দুই বিলিয়ন ডলারের এআই স্বপ্ন, নাকি জলসংকটের নতুন ঝুঁকি?

ফকির আনোয়ার

২ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার বাংলাদেশে কতটা পরিবেশবান্ধব? এআই প্রযুক্তির বিপুল পানির চাহিদা ও বাংলাদেশের জলনিরাপত্তা নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ করেছেন পরিবেশকর্মী ফকির আনোয়ার।

প্রকাশিত:
মতামত জলবায়ু

বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ মহলে হঠাৎ করেই আলোচনায় উঠে এসেছে একটি সংখ্যা, ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে দেশে একটি “ফ্রন্টিয়ার এআই ডেটা সেন্টার অ্যান্ড কোয়ান্টাম-রেডি স্বাধীন কম্পিউট ক্যাম্পাস” গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এডিআইসি (ADIC)। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ পরিসরের এআই অবকাঠামো। কিন্তু এই সম্ভাবনার আড়ালে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে, যা প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের চেয়ে নদী ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের কাছেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এআই অবকাঠামোর সঙ্গে জলনিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে? অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পটি এখনও প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থায়নের নিশ্চয়তা কিংবা পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প নথি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। তবে যেটুকু তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, তা থেকেই বোঝা যায় যে বাংলাদেশের নদী, ভূগর্ভস্থ পানি ও কৃষির সঙ্গে জড়িত অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত।

এডিআইসি’র প্রস্তাবটি কী 
গত ৩১ জুলাই ২০২৬ জাগো নিউজ ২৪-এ প্রথম প্রকাশিত এবং পরে দ্য ক্লাইমেট ওয়াচসহ অন্যান্য মাধ্যমে পুনঃপ্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এডিআইসির প্রস্তাবে গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক অথবা সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডেটা সেন্টার স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবে স্বাক্ষরকারী এস এম আনিসুর রহমান নিজেকে এডিআইসির প্রধান নির্বাহী ও এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার স্থপতি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং লন্ডনের র‌্যাভেন্সবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক বলে উল্লেখ করেছেন। প্রস্তাবটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।  পরিকল্পনাটি তিনটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে, আগামী ২৪ মাসের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ফ্রন্টিয়ার এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, যা সরকারি সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সেবা দেবে। দ্বিতীয় ধাপে, ২৪ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে ক্ষমতা বাড়িয়ে ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক এআই কম্পিউট হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তৃতীয়, দীর্ঘমেয়াদি ধাপে কোয়ান্টাম-রেডি অবকাঠামো যুক্ত করে একটি জাতীয় এআই গবেষণা বাস্তুতন্ত্র বা Ecosystem গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ তথ্য ও ডিজিটাল সেবা বর্তমানে বিদেশে অবস্থিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ভেতরেই তথ্য সংরক্ষণ সম্ভব হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষয় কমবে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি বৃহৎ ভাষা মডেল বা এলএলএম তৈরির সুযোগ তৈরি হবে, যাতে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের তথ্য দেশের নিজস্ব আইনি কাঠামোর অধীনে সংরক্ষিত থাকতে পারে। প্রস্তাবে প্রায় ১০ হাজার প্রত্যক্ষ ও ৫০ হাজারের বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থান এবং ৬০ হাজার পরিবারের উপকৃত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। উঁচু ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১০০ মেগাওয়াটের একটি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।

প্রশ্নের মুখে কোম্পানির পরিচয় ও তথ্যের স্বচ্ছতা
প্রতিবেদনটির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ সম্ভবত এখানেই। স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি, যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এডিআইসি এর আগে কোথাও বড় পরিসরের হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার নির্মাণ বা পরিচালনার অভিজ্ঞতা রাখে। একই নামে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও, সেগুলোর সঙ্গে এই প্রস্তাবদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের একটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে আসবে বলে বলা হলেও, কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল বা প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠানের নাম এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট নিবন্ধন, মালিকানা কাঠামো ও পূর্ববর্তী প্রকল্পের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ পাওয়া জরুরি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। এডিআইসির বাংলাদেশ প্রকল্প পরিচালক, বুয়েটের প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান এবং যোগাযোগ পরিচালক আশরাফুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ডাক-টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছেন এবং কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক ইতিমধ্যে পরিদর্শন করেছেন।

সরকারের অবস্থান কী
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, আগামী চার-পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ডেটা সেন্টার অবকাঠামো সম্প্রসারণকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, এবং লক্ষ্য হলো এমন এআই সক্ষমতা গড়ে তোলা যার ওপর ভিত্তি করে স্টার্টআপ, ডেটা সেন্টার অপারেটর, ফ্রিল্যান্সার ও উদ্ভাবকেরা নতুন সেবা তৈরি করতে পারবেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া বলেছেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও আলোচনা চলছে, তবে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি এবং আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, সরকার প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে এমন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

প্রেক্ষাপট: বিশ্বজুড়ে এআই ডেটা সেন্টারের বিস্তার ও পানির হিসাব
বাংলাদেশের এই একক প্রস্তাবটিকে বুঝতে হলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটটি জানা জরুরি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলো ২০২৩ সালে প্রায় ৫৬০ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করেছে, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১,২০০ বিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে। জাতিসংঘের United Nations University-এর Institute for Water, Environment and Health (UNU-INWEH) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানি-ফুটপ্রিন্ট ছিল আনুমানিক ৪.৫ ট্রিলিয়ন লিটার, যা প্রায় ১৮ লাখ অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুল পূর্ণ করার সমান। এবং এআই-নির্ভর প্রবৃদ্ধির উচ্চ পরিস্থিতিতে ২০৩০ সাল নাগাদ তা ৯.৩ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে। একটি হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত ইভাপোরেটিভ কুলিং ব্যবহারকারী ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টার দৈনিক প্রায় ২০ লাখ লিটার পানি ব্যবহার করতে পারে,  অর্থাৎ এডিআইসির প্রস্তাবিত দ্বিতীয় ধাপের ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র সাধারণ প্রযুক্তিতে দৈনিক কয়েক লাখ থেকে ৪০ লাখ লিটারের মতো পানি প্রয়োজন করতে পারে, যদিও ক্লোজড-লুপ বা এয়ার কুলিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এখনও যাত্রার একেবারে শুরুতে। প্রতিবেশী ভারতে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৯৬টি ডেটা সেন্টার চালু ছিল, আর মেটা, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে সেখানে। মালয়েশিয়ায় এআই বিদ্যুৎ চাহিদা ২০৩০ সাল নাগাদ আটগুণ বেড়ে জাতীয় বিদ্যুতের প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই তুলনায় বাংলাদেশে এখনও কোনো বৃহৎ পরিসরের এআই ডেটা সেন্টার চালু বা আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়নি, একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ২ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এখনও আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ, যে প্রতিষ্ঠানের কোন ওয়েবসাইট নেই বা এখনো তাদের দেওয়া তথ্যের স্বচ্ছতা বুঝার কোন উপায় দেখা যাচ্ছে না।

তবে বাংলাদেশ একেবারে খালি হাতে নেই। বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের জন্য  (South-East Asia–Middle East–Western Europe) SEA-ME-WE-4 ও SEA-ME-WE-5-এর ওপর নির্ভর করে। সি-মি-উই-৬ সাবমেরিন কেবল ২০২৬ সালে সেবায় যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে, যার নকশাকৃত ক্ষমতা বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে অধিকতর হবে। স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ পরিকল্পনার আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি বর্তমান ২.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি হচ্ছে ধীরে হলেও, বড় পরিসরের বিদ্যুৎ ও পানি-নির্ভর অবকাঠামো এখনো তুলনামূলকভাবে নতুন এক চ্যালেঞ্জ, যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি ও তদারকি কাঠামো এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।

রিভারাইন পিপলের দৃষ্টিতে: নদী, ভূগর্ভস্থ পানি, কৃষি ও জলবায়ু অভিযোজন
প্রস্তাবিত দুটি স্থান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও সিরাজগঞ্জ, দুই ক্ষেত্রেই নদী, বন্যা সমভূমি ও ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কালিয়াকৈর তুরাগ-বংশী নদী ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দীর্ঘদিনের শিল্পায়নের কারণে এ অঞ্চলের পানি ও পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় কালিয়াকৈর–কোনাবাড়ি শিল্পাঞ্চলে শিল্পবর্জ্যজনিত পানি ও মাটিদূষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর শিল্পকারখানার উল্লেখযোগ্য নির্ভরতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় কালিয়াকৈরকে আশুলিয়া ও বাইপাইলের সঙ্গে এমন একটি শিল্পাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তুলনামূলকভাবে গভীরে এবং অতিরিক্ত উত্তোলনকে পানিস্তর কমার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি ভিন্ন ধরনের: জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা যমুনার বন্যা সমভূমির সঙ্গে যুক্ত এবং গবেষণায় নিম্নভূমি এলাকায় নিয়মিত বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি এবং ভূগর্ভস্থ পানির মান ও স্তর নিয়ে উদ্বেগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে শিল্প খাতের প্রায় ৯৮ শতাংশ পানি এখনও ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে তোলা হয়, এবং গাজীপুর এই সংকটের একেবারে কেন্দ্রে। একই সঙ্গে বংশী, তুরাগ ও ধলেশ্বরী নদী শিল্পবর্জ্যে এতটাই দূষিত যে, এই নদীর পানি সরাসরি কুলিং সিস্টেমে ব্যবহার করাও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হয়ে দাঁড়াতে পারে।  অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত একটি জেলা, যেখানে যমুনার শাখা কাজীপুর নদী গিয়ে মিশেছে ইছামতী নদীতে, যে ইছামতী ও যমুনা অববাহিকা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড রিভারস্কেপ গবেষণা পরিচালনা করছে এবং যমুনার প্রবাহ বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে। এ থেকে বোঝা যায়, এআই অবকাঠামোর অবস্থান নির্বাচনের প্রশ্নটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে না; এটি সরাসরি জড়িয়ে আছে দেশের নদীব্যবস্থার সেই বৃহত্তর জালের সঙ্গে, যার ওপর নির্ভর করে লাখো মানুষের কৃষি, মৎস্য ও জীবিকা।

নদীর ধারে স্থাপনার পক্ষে যুক্তি আছে বৈকি, কুলিং-এর পানি সহজে সংগ্রহ করা যায় এবং শোধিত পানি নদীতে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্লোজড-লুপ ব্যবস্থা তুলনামূলক সহজ হয়, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পারে। কিন্তু সতর্কতার যুক্তিও কম শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশ একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে অনেক নদীর প্রবাহ এমনিতেই কমে যায়। বোরো ধান চাষের মৌসুমে সেচের ৭০ শতাংশের বেশি নির্ভর করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে। এমন অবস্থায় একটি বৃহৎ শিল্প-চাহিদা যুক্ত হলে তা নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ, কৃষি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানি ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে, দেখায় যে ডেটা সেন্টারের পানি ব্যবহার নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।

এডিআইসির প্রধান নির্বাহী এস এম আনিসুর রহমান পরিবেশগত উদ্বেগের জবাবে বলেছেন, প্রকল্পের শুরু থেকেই পরিবেশ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং পানি খরচ কমাতে ডাইরেক্ট লিকুইড কুলিং ও ক্লোজড-লুপ কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে, পাশাপাশি সৌর, বায়ু ও টেকসই বর্জ্য-থেকে-শক্তি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুতের একটি বড় অংশ সরবরাহের ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো এখনও কোনো স্বাধীন প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি, এবং প্রকল্পের প্রকৃত দৈনিক পানির চাহিদা কত হবে, তা কোনো প্রকাশিত নথিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্মার্ট বিল্ডের চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন রিয়াদ সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশে বড় আকারের AI ডেটা সেন্টার গড়ে উঠলে বিদ্যমান পানি ও জ্বালানি সংকট বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা জরুরি; তা না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির AI ডেটা সেন্টারে বিপুল তাপ উৎপাদন এবং তা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় water-cooling ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য একটি বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সুশাসনের প্রশ্ন: কী নিশ্চিত করা দরকার
বিশেষজ্ঞদের আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে, বাংলাদেশ যদি এ ধরনের বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে চায়, তবে অন্তত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। ক) একটি স্বাধীন পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা ইআইএ, যা প্রকল্প শুরুর আগেই সম্পন্ন ও প্রকাশ্যে উন্মুক্ত করা; খ) একটি পৃথক জল-প্রভাব মূল্যায়ন বা ওয়াটার ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, যা ভূগর্ভস্থ পানি, নদীর প্রবাহ ও স্থানীয় সেচের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরবে; গ) ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে পুনর্ব্যবহৃত বা পরিশোধিত পানির ব্যবহার, এবং কুলিং প্রযুক্তির স্বাধীন যাচাই; ঘ) পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বার্ষিক প্রকাশ্য প্রতিবেদন, যাতে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান নজরে রাখা যায়; ঙ) নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত ব্যবহারের হার নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা; চ) স্থানীয় জনগণ, বিশেষত নদী ও কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে পরামর্শ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রতি সরাসরি জবাবাদিহি থাকা; ছ)  প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, করপোরেট পরিচয় ও অর্থায়নের উৎসের স্বাধীন যাচাই।  এই সুপারিশগুলোকে পাঁচটি সহজ প্রশ্নে রূপান্তর করা যায়, যেগুলোর উত্তর বাংলাদেশের সামনে এখনও অমীমাংসিত, প্রকৃত বিনিয়োগকারী কারা? পানি আসবে কোথা থেকে? বিদ্যুৎ কত লাগবে? ইআইএ প্রকাশ করা হবে কি? আর স্থানীয় মানুষ কীভাবে উপকৃত হবে?

মূল কথাটি হচ্ছে, এআই ডেটা সেন্টার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় বিতর্ক পানি নিয়েই। ডেটা সেন্টারকে সারাক্ষণ ঠান্ডা রাখতে হয়, এবং সেই তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানি অথবা ব্যয়বহুল উন্নত কুলিং প্রযুক্তি। বাংলাদেশ এমনিতেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া, উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাবের মুখোমুখি একটি দেশ। এই বাস্তবতায় বড় পরিসরের এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার আগে পানির চাহিদা, পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা রাখা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। তবে ঝুঁকির পাশাপাশি সম্ভাবনার দিকটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে একই এআই প্রযুক্তি নদী পর্যবেক্ষণ, বন্যা পূর্বাভাস, দূষণ শনাক্তকরণ এবং সামগ্রিক জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, অর্থাৎ প্রযুক্তিটি নিজেই নদী-বান্ধব হয়ে উঠতে পারে, যদি তার নকশা ও অবস্থান নির্ধারণে নদী ও পানিসম্পদের বাস্তবতাকে শুরু থেকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়।  সবকিছু মিলিয়ে দেখলে, প্রশ্নটি আসলে বিনিয়োগ হবে কি না,  সেটি নয়। প্রশ্নটি হলো, কী ধরনের শর্ত, স্বচ্ছতা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে সেই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশের নদী, ভূগর্ভস্থ পানি এবং কোটি মানুষের কৃষি ও জীবিকা এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে।

  • ফকির আনোয়ার, পরিবেশকর্মী ও লেখক
    * (মতামত লেখকের নিজস্ব)